ঐতিহ্যের পুজো: কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রাজরাজেশ্বরী

রাজরাজেশ্বরীর পুজো বলে কথা। এই স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে আছে কৃষ্ণনগরবাসী

ঐতিহ্যের পুজো: কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রাজরাজেশ্বরী

আরোহী নিউজডেস্ক: "মুকুটটা তো পড়ে আছে রাজাই শুধু নেই, আমার ভালবাসার রাজপ্রাসাদে"। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী প্রয়াত 'মান্না দে'র গাওয়া বিখ্যাত এই গান কৃষ্ণনগর রাজপ্রাসাদের তোরনের সামনে এলেই মনে পড়ে যায়। আজ সেই রাজাও নেই রাজার রাজত্বও নেই, পড়ে আছে শুধু স্মৃতি। রাজার বাড়ির দুর্গা উৎসব। রাজরাজেশ্বরীর পুজো বলে কথা। আর এই স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে কৃষ্ণনগরবাসী।

ইতিহাস সাক্ষী নদিয়া রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ মজুমদার মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের দেওয়া ফরমানে রাজা হয়েছিলেন। জনশ্রুতি, তিনি অন্নপূর্ণার পুজো করতেন। পরবর্তী কালে এই পরিবারে দুর্গোৎসবের প্রচলন হয়। ভবানন্দের উত্তরপুরুষ রাঘব রায় মাটিয়ারি থেকে রেউই গ্রামে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। পরে মহারাজ রুদ্র রায়ের আমলে এই জায়গার নতুন নামকরণ হয় কৃষ্ণনগর। তিনি ঢাকা থেকে আলাল বক্স নামে এক স্থপতিকে আনিয়ে তৈরি করান চকবাড়ি, কাছারিবাড়ি, হাতিশালা, আস্তাবল, নহবৎখানা এবং পঙ্খ অলঙ্কৃত দুর্গাদালান। রুদ্র রায়ের উত্তরপুরুষ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় মহা সমারোহে এই পারিবারিক পুজো করতেন। তিনিই প্রথম সর্বসাধারণের মধ্যে দুর্গোৎসবের প্রচলন করেন যা পরবর্তী কালে সর্বজনীন রূপে পরিচিতি পায়।

রাজবাড়ির পঙ্খ অলংকৃত দুর্গাদালানে অধিষ্ঠান রাজরাজেশ্বরীর। এটাই রাজবাড়ির দুর্গার প্রচলিত নাম। উল্টোরথের পরের দিন পাটপুজোর মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের কাজ। প্রচলিত দুর্গা প্রতিমার চেয়ে আলাদা এই মূর্তি। দেবী দুর্গার সামনের দু’টি হাত বড়, পিছনের আটটি হাত আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট। দেবীর গায়ে থাকে বর্ম, এখানে তিনি যুদ্ধের বেশে সজ্জিত। পিছনে অর্ধগোলাকৃতি সাবেক বাংলা চালির এক দিকে আঁকা থাকে দশাবতার, অন্য দিকে দশমহাবিদ্যা। মাঝে থাকেন পঞ্চানন শিব। দেবীর বাহন পৌরাণিক সিংহ। সামনে থাকে ঝুলন্ত অভ্রধারা। প্রতিমার সাজেরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রচলিত ডাকের সাজের চেয়ে আলাদা। একে বলা হয় ‘বেদেনি ডাক’। আগে সোনার গয়না পরানো হত। এখন সেই গহনার চমক না থাকলেও বেদিনি ডাকের সাজের চমক কম নয়।


মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের উত্তরপুরুষ সৌমীশচন্দ্র রায় জানান, "আজও পুজোর জন্য গঙ্গা জল আনা হয় নবদ্বীপ থেকে। হোম শুরু হয় শুক্লা প্রতিপদ থেকে, চলে দশমী পুজোর শেষ পর্যন্ত। পুজোয় ভোগেরও বৈচিত্র রয়েছে। তিন দিনই থাকে খিচুড়ি, ভাজা, তরকারি, চাটনি এবং সুজির পায়েস। এ ছাড়া সপ্তমীতে সাত রকম ভাজা। অষ্টমীতে পোলাও, ছানার ডালনা, ভাত, আট রকম ভাজা, ক্ষীর। নবমীতে ভাত, নয় রকম ভাজা, তিন রকম মাছ, ইত্যাদি। আর শীতল ভোগে থাকে লুচি, ভাজা, তরকারি ও সুজি"।

রাজবাড়ীর পুজো বলে কথা তাই এখন কৃষ্ণগর বাসীর মধ্যে এই পুজোকে নিয়ে একটা আবেগ রয়ে গেছে। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা টুম্পা সকার জানান, " রাজ বাড়ির দুর্গা প্রতিমা দর্শন না করলে দেবীর মহিমা বোঝা যাবে না। কৃষ্ণগর বাসীর কাছে এই পুজোর গুরুত্ব অনেকটা বেশি এবং রাণীমার সাথে সিঁদুর খেলার যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়"। 


আসলে আজও রাজবাড়ীর পুজোকে ঘিরে এই শহরের মানুষের মনে আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তাই আজও রাজবাড়ির সন্ধিপুজো দেখতে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। প্রথা মতোই থাকে ১০৮টি পদ্মফুল ও ১০৮টি প্রজ্বলিত প্রদীপ। দশমীর দিন হয় যাত্রামঙ্গল অনুষ্ঠান, তাতে রাজ পরিবারের সদস্যদের দর্শন করতে হয় বিশেষ কিছু জিনিস। যেমন ‘সবৎস্য ধেনু’, ‘বৃষ’, ‘গজ’, ‘ঘোড়া’, ‘নৃপ’, ‘গণিকা’ ইত্যাদি। এ ছাড়া দশমীর অন্য আকর্ষণ সিঁদুর খেলা। দূরদূরান্ত থেকে বহু সধবা আসেন রাজরাজেশ্বরীকে সিন্দুর দিতে। তার পরই হয় সিঁদুর খেলা। প্রতিমা নিরঞ্জনের পরে পুরনো প্রথা অনুসারে গৃহকর্তা বোধনের বেলতলায় কাঁচা মাটির তৈরি শত্রুর প্রতীকী মূর্তি তীর-ধনুক দিয়ে বধ করেন। অতীতে রাজা যেমন শত্রু বধ করে দেশের সকলকে রক্ষা করতেন, এই প্রথার মধ্যে দিয়ে সেই তাৎপর্যটি তুলে ধরা হয়। পুরনো সেই প্রথা মেনেই এখন এই পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান বংশধরেরা।


এ পুজোতে নেই শহুরে প্যাকেজিং, নেই লাইটের ঝলকানি  যা আছে তা ঐতিহ্য এবং আভিজাত্য। আর এ দু'ই মিলে গিয়ে এই পুজোয় আজও মেলে অতীতের সেই সৌরভ। নামে রাজার বাড়ির পুজো। কিন্তু রাজার রাজত্ব তো আর নেই, কাজেই রাজা থাকারও প্রশ্ন নেই। সে না থাক তাতে কি হয়েছে, অস্তমিত রাজমহিমার রেশটুকু থাকলেই হবে। আর সেটুকু আছে বলে পুরনো নহবৎখানা, নাটমন্দির, দালান কিংবা তোরণ আজও ফিসফিস করে বলে ওঠে সে সব পুজোর কাহিনি ও তার জৌলুস। রাজবাড়ীর আনাচে-কানাচে কান পাতলেই শোনা যায় "মুকুটটা তো পড়ে আছে রাজাই শুধু নেই, আমার ভালবাসার রাজপ্রাসাদে"।