‘আমার যখন কাজ ছিল না, চূর্ণী সংসার চালিয়েছে’, স্ত্রীকে ‘পূর্ণাঙ্গিনী’ আখ্যা কৌশিকের

Jul 10, 2026 - 17:46
 0  0
‘আমার যখন কাজ ছিল না, চূর্ণী সংসার চালিয়েছে’, স্ত্রীকে ‘পূর্ণাঙ্গিনী’ আখ্যা কৌশিকের

তিন বছর আগে মুক্তি পাওয়া কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অর্ধাঙ্গিনী’ এখনও দর্শকের মনে সমানভাবে জায়গা করে রয়েছে। বক্স অফিসে সাফল্যের পাশাপাশি ছবির দ্বিতীয় পর্বের দাবিও উঠেছিল বারবার। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতেই এবার প্রেক্ষাগৃহে এসেছে ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’।

ছবির শুভ্রা চরিত্রে অভিনয় করা চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, প্রথম ছবির হল ভিজিটের সময় থেকেই তাঁকে এবং জয়া আহসানকে দর্শকেরা জিজ্ঞেস করতেন, দ্বিতীয় পর্ব কবে আসবে। তিন বছর পর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটায় তিনি আনন্দিত।

পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, শুধু বাংলার দর্শকই নয়, বিদেশেও বহুবার সিক্যুয়েলের দাবি শুনেছেন তিনি। এমনকি দ্বিতীয় ছবি তৈরির সময়েই প্রযোজক তাঁকে তৃতীয় পর্বের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তবে কৌশিকের স্পষ্ট বক্তব্য, ভবিষ্যতে আরও একটি ছবি হবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে দর্শকের আগ্রহের উপর।

রিলের পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও কৌশিক ও চূর্ণী দীর্ঘদিনের সৃজনশীল সঙ্গী। কৌশিকের পরিচালনায় বারবার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন চূর্ণী। ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-তে শুভ্রার চরিত্রে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিন বছর আগে চরিত্রটির যে মানসিক অবস্থা ছিল, সময়ের সঙ্গে তা কীভাবে বদলেছে, সেটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে। একজন নারীর মানসিক দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কের বিবর্তনকে তিনি গভীরভাবে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন।

কৌশিকের মতে, চূর্ণীর ব্যক্তিত্ব কোনও চরিত্র নির্মাণের সময় লেখককে আলাদা করে ভাবতে বাধ্য করে। তাঁর ভাবনাকে পর্দায় প্রকাশ করার জন্য যে মুখ এবং অভিনয়শক্তি প্রয়োজন, তা তিনি চূর্ণীর মধ্যে খুঁজে পান। ছবির পোশাক ও চরিত্রের উপস্থাপনাতেও চূর্ণীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

চূর্ণীর একটি পর্যবেক্ষণ ছিল, জীবনে গভীর সংকট থাকলেই একজন মানুষ সবসময় সাদামাটা বা বিবর্ণ পোশাকে থাকবেন, এমন নয়। তিনি রঙিন পোশাক পরতে পারেন, সুন্দরভাবে নিজেকে সাজাতে পারেন। সেই ধারণাটিও ছবিতে ব্যবহার করেছেন কৌশিক।

দুই সৃজনশীল মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন চূর্ণী। তাঁর এবং কৌশিকের সিনেমা দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা, তাঁদের নির্মিত ছবির ধরনও পৃথক। তবে আলোচনার মাধ্যমেই তাঁরা সেই ভিন্নতা সামলে নেন। কৌশিক জানান, তাঁর ছবির চিত্রনাট্যে চূর্ণী ও তাঁদের ছেলে উজানের অবদান অনেক। তাঁদের বাড়ির ডাইনিং টেবিলেই বহু গল্প ও চরিত্রের জন্ম হয়।

জুলাই মাসটি গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১০ জুলাই মুক্তি পেয়েছে ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’। আবার ২৪ জুলাই মুক্তি পাবে উজান গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত প্রথম বাংলা ছবি ‘কাতুকুতু বুড়ো’। দুটি ছবির সঙ্গেই কোনও না কোনওভাবে যুক্ত রয়েছেন চূর্ণী।

ছেলের প্রথম বাংলা ছবি মুক্তির আগে গর্বিত কৌশিক ও চূর্ণী। অক্সফোর্ডের প্রাক্তনী উজান বরাবরই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন। কৌশিক জানান, বাবা-মা হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব ছিল ছেলেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া। এরপর নিজের যোগ্যতায় উজান নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।

তবে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা-মায়ের ভাবনায় একসময় পার্থক্য ছিল। কৌশিক চেয়েছিলেন, উজান দ্রুত চলচ্চিত্র পরিচালনায় মন দিক। অন্যদিকে চূর্ণী চাইতেন, সে আগে পড়াশোনা শেষ করুক। কৌশিক মেনে নিয়েছেন, শিক্ষার বিষয়ে উজানের উপর চূর্ণীর কঠোর নজর ছিল।

নেপোটিজমের অভিযোগ উঠতে পারে কি না, সেই প্রসঙ্গে কৌশিকের স্পষ্ট বক্তব্য, তিনি কখনও ছেলেকে নিজের ছবির মাধ্যমে ‘লঞ্চ’ করতে চাননি। চাইলে প্রথম সুযোগ তিনিই দিতে পারতেন। চূর্ণীও জানিয়েছেন, তাঁরা কোথাও উজানকে সুপারিশ করবেন না বা বিশেষ সুবিধা দেবেন না। আজও নিজের ছবির প্রয়োজনে উজান ক্যাবে যাতায়াত করেন, পরিবারের গাড়ি ব্যবহার করেন না।

কৌশিকের মতে, চলচ্চিত্রে পারিবারিক পরিচয়ের কারণে কেউ প্রথম সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু প্রতিভা না থাকলে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।

সমাজমাধ্যমের ট্রোলিং প্রসঙ্গে কৌশিক বলেন, অনেকেই সাফল্য দেখেন, কিন্তু তার পিছনের পরিশ্রম ও ত্যাগ বোঝেন না। তাঁর কথায়, চূর্ণী শুধু তাঁর অর্ধাঙ্গিনী নন, পরিবারের ‘পূর্ণাঙ্গিনী’। কৌশিকের হাতে কাজ না থাকার সময় চূর্ণী টেলিভিশনে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন।

দু’জনেরই পেশাজীবনের শুরু থিয়েটার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে। তাই ছোটপর্দার প্রতি তাঁদের গভীর কৃতজ্ঞতা রয়েছে। চূর্ণী একসময় মুম্বইয়েও নিয়মিত কাজ করতেন। এমনকি একতা কাপুর তাঁকে স্থায়ীভাবে সেখানে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁকে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিকও প্রস্তাব করা হয়েছিল।

তবে ছেলে উজান এবং পরিবারের কথা ভেবে সেই সুযোগ ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন চূর্ণী। তিনি চাননি, উজান তার বাবার থেকে দূরে বড় হোক। কৌশিক জানান, ছেলের জন্য চূর্ণী সন্ধ্যা ছ’টার পর শুটিং পর্যন্ত করতেন না। পরিবারকে একসঙ্গে রাখার জন্য তিনি নিজের মুম্বইয়ের সম্ভাবনাময় কেরিয়ারও ত্যাগ করেছেন।

চূর্ণীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত যাত্রা নিয়ে ছবি তৈরি হলে সেটি সফল হবে বলেও মনে করেন কৌশিক। তবে সেই ছবি তিনি নিজে পরিচালনা করবেন কি না, তা এখনও ভাবেননি।

চূর্ণীর অভিনয়প্রতিভা বাংলা সিনেমায় যথেষ্ট ব্যবহার করা হয়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন কৌশিক। তাঁর মতে, ‘অর্ধাঙ্গিনী’-র জন্য বহু পুরস্কার পাওয়া এবং একই বছরে ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’-তে অভিনয় করার পরও বাংলায় তাঁকে প্রত্যাশিত পরিমাণ কাজ দেওয়া হয়নি।

তবে এ নিয়ে কারও উপর ক্ষোভ নেই চূর্ণীর। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা তাঁকে কাজ দেননি, তাঁরা হয়তো তাঁকে উপযুক্ত মনে করেননি। কখনও কখনও তাঁর নিজেরও মনে হয়েছে, হয়তো তাঁকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূল্যায়ন করা হয়েছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0