জীবিত ব্যক্তির পাঁজর ভেঙে ‘ডানা’! সত্যিই কি নিষ্ঠুরতা আর ভাইকিং ছিল সমার্থক?
শিংওয়ালা শিরস্ত্রাণ। হাতে ধারালো অস্ত্র। ক্রোধের প্রতীক। রক্তপিপাসু। যোদ্ধা। হানাদার। ‘ভাইকিং’ বললেই একে একে বহু শব্দ বা শব্দবন্ধ উঠে আসবে। সমুদ্রে ড্রাগন বা সাপের মতো মুখ আঁকা জাহাজ মানেই অপরিসীম আতঙ্কের জন্ম হত সেই পুরনো পৃথিবীতে! এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচের পর মাঠে বসেই নৌকো বাইতে দেখা গিয়েছে গোটা নরওয়ে দলকে। আর্লিং হালান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডদের এই ‘ভাইকিং রো’ এখন ভাইরাল। যা ফের আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে মধ্যযুগের যোদ্ধাদের।
ভাইকিংদের ‘গল্প’ বলতে বসলে প্রথমেই যেটা আলোচনায় উঠে আসবে সেটা নিষ্ঠুরতা। অপরিসীম নিষ্ঠুরতা। যারা ‘শত্রু’র পাঁজরের হাড় বিচ্ছিন্ন করে ‘ডানা’ বানিয়ে দিত! একে বলা হত ‘ব্লাড ঈগল’। এমন বিপুল নিষ্ঠুরতার আবরণে ঢাকা ভাইকিংরা হয়ে গিয়েছে নিষ্ঠুরতার সমার্থক। কিন্তু সত্যিই কি তারা ছিল এমন নিষ্ঠুর?
সেকথায় আসার আগে বলা যায়, কারা ছিল ভাইকিং? এককথায় বললে উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের (বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক) সাহসী নাবিক, যোদ্ধা এবং ব্যবসায়ী। অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে ভাইকিং যুগ বলা হয়। এই সময়কাল জুড়ে ইউরোপজুড়ে চলত তাদের দৌরাত্ম্য। ভাইকিংদের ইতিহাস সমুদ্র অভিযানের এক অনন্য অধ্যায়। লুটপাট ও যুদ্ধের জন্য তাদের মূল পরিচিতি হলেও নৌ-প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং নতুন অঞ্চল আবিষ্কারে তাদের অবদানকে কে অস্বীকার করবে? তবু সেই সব দূরে সরিয়ে রেখে ভাইকিংদের নিষ্ঠুর অভিযানই যেন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
যার মধ্যে, আগেই বলেছি, ‘ব্লাড ঈগল’ সবচেয়ে ভয়াবহ। বন্দিদের পিঠের চামড়া ও পেশির বড় অংশ কেটে আলাদা করে মেরুদণ্ড থেকে পাঁজরের হাড়গুলো বিচ্ছিন্ন করে দু’পাশে ছড়িয়ে দেওয়া হত। যাতে সেগুলো দেখতে অনেকটা ‘ডানা’র মতো মনে হয়। এখানেই শেষ নয়। ওই হতভাগ্যের অক্ষত ফুসফুস দুটি বের করে সেই ছড়িয়ে দেওয়া পাঁজরের ওপর স্থাপন করা হত। গবেষকদের মতে, এই পর্যায়ে পৌঁছনোর আগেই তাঁর মৃত্যু হত। কিন্তু এতটা অত্যাচার কি সত্যিই করা যায়? বছর কয়েক আগে এক গবেষণায় দেখা যায়, সত্যিই এটা সম্ভব! আমাদের শরীর একটা বিপুল সময় পর্যন্ত এমন নারকীয় নির্যাতন সইতে পারে। তবে আরও একটা বিষয়ে গবেষকরা একমত। গোটা প্রক্রিয়াটা কারও পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব!
তবে এমন নিষ্ঠুরতার আখ্যানের পরও প্রশ্ন থেকে যায়। ভাইকিংরা কি ‘সারাসেন’ কিংবা ‘ম্যাগিয়ার’ গোষ্ঠীর চেয়েও বেশি আক্রমণাত্মক ছিল? গবেষকরা বলছেন, তা নয়। হাঙ্গেরির ম্যাগিয়ার গোষ্ঠীর বাভারিয়া অঞ্চলের লুঠতরাজ কিংবা ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও ইটালির বিভিন্ন অঞ্চলে সারাসেন নামে পরিচিত মুসলিম হানাদারদের আক্রমণের তীব্রতা কিছু কম ছিল না। এমন আরও উদাহরণ রয়েছে। তবু ভাইকিংরাই কেন যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত। তাদের নামোচ্চারণে মিশে আছে রক্তের কাঁচা ঘ্রাণ!
আসলে ভাইকিংরা ছিল মূলত অক্ষরজ্ঞানহীন। তাদের কার্যকলাপের খুব সামান্যই লিখিত হিসেবে তারা লিখে যেতে পেরেছিল। বরং তাদের কর্মকাণ্ডের লিখিত প্রমাণের একটা বড় অংশই লিখেছেন তাদের দ্বারা আক্রান্ত মানুষেরা। অথবা শয়ে শয়ে বছর পরে তাদেরই উত্তরসূরিদের লেখা ‘সাগা’ বা বীরত্বগাথাও ভাইকিংদের কথা বলে। এখন, আক্রান্তরা যে ভাইকিংদের সহিংসতার কথা আরও বাড়িয়ে লিখবেন, সেটাই স্বাভাবিক। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিংদের নৃশংসতার গল্পগুলো সম্ভবত অতিরঞ্জিতও করা হয়েছে।
অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যাটলিন এলিস বলছেন, ”ভাইকিংদের যে অত্যন্ত হিংস্র বা বর্বর হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেগুলো আসলে কিছুটা পরবর্তী সময়ের। অর্থাৎ তাদের লুঠতরাজ শুরুর কয়েকশো বছর পরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অতিরঞ্জনের বিষয়টি এমন এক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যা আজও আমাদের মধ্যে রয়ে গিয়েছে।”
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0