বাংলার মডেলেই এবার দেশজুড়ে শিশুদের ডায়াবেটিস চিকিৎসা, কলকাতায় ২৯ রাজ্যের জাতীয় কর্মশালা

Jul 10, 2026 - 16:36
 0  0

শিশুদের ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় পশ্চিমবঙ্গের সফল উদ্যোগ এবার জাতীয় স্তরে অনুসরণ করা হচ্ছে। রাজ্যে তৈরি মডেলের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কর্মসূচি বা আরবিএসকে ২.০-এর আওতায় শিশুদের ডায়াবেটিস দ্রুত চিহ্নিতকরণ এবং চিকিৎসার জন্য নতুন জাতীয় নির্দেশিকা কার্যকর করতে চলেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক।

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি হোটেলে শুরু হয়েছে দু’দিনের জাতীয় কর্মশালা। দেশের ২৯টি রাজ্য থেকে প্রায় ১০০ জন নোডাল অফিসার এতে অংশ নিয়েছেন। রাজ্যস্তরে নতুন নির্দেশিকা কীভাবে কার্যকর হবে, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিষেবা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়েই কর্মশালায় বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে।

গত ৩০ এপ্রিল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আরবিএসকে ২.০ এবং শিশুদের টাইপ-১ বা জুভেনাইল ডায়াবেটিস মোকাবিলায় সংশোধিত জাতীয় নির্দেশিকা প্রকাশ করেন। এই নির্দেশিকার ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শিশু ডায়াবেটিস চিকিৎসার মডেল।

দেশে শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য প্রথম মডেল ক্লিনিক তৈরি এবং তার সম্প্রসারণ হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গেই। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর, আইপিজিএমইআর ও এসএসকেএম হাসপাতালের এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সুজয় ঘোষ এবং ইউনিসেফ পশ্চিমবঙ্গের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় এই উদ্যোগ গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেই মডেলই জাতীয় নির্দেশিকার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

২০২১ সালে অধ্যাপক ডা. সুজয় ঘোষের নেতৃত্বে রাজ্যের পাঁচটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি শুরু হয়। এর আওতায় শিশুদের দ্রুত রোগ নির্ণয়, নিয়মিত ফলোআপ, বিনামূল্যে ইনসুলিন এবং পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হতো। প্রকল্পটির সাফল্য এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই দেশজুড়ে এই পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করেছে। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট ডায়াবেটিস বা আইএসপিএডি মডেলটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইতিমধ্যেই ছয়টিরও বেশি দেশ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চেয়েছে।

জাতীয় কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম, স্বাস্থ্য অধিকর্তা ডা. স্বপন সোরেন, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব ও মিশন ডিরেক্টর আরাধনা পট্টনায়ক, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের মিশন ডিরেক্টর প্রীতি গোয়েল এবং অধ্যাপক ডা. সুজয় ঘোষ-সহ কেন্দ্র ও রাজ্যের একাধিক স্বাস্থ্যকর্তা ও বিশেষজ্ঞ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ২০ বছরের কম বয়সি প্রায় ১১ লক্ষ শিশু ও কিশোর টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে বহু ক্ষেত্রেই দেরিতে রোগ ধরা পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তেষ্টা, ঘন ঘন প্রস্রাব, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত রক্তে শর্করার পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

আরবিএসকে ২.০-এর অধীনে স্কুল, মোবাইল হেলথ টিম এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে উপসর্গযুক্ত শিশুদের দ্রুত চিহ্নিত করে চিকিৎসার আওতায় আনা হবে। নতুন কর্মসূচিতে শুধু টাইপ-১ ডায়াবেটিস নয়, কিশোর বয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, বিকাশজনিত সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও নিয়মিত পরীক্ষা করা হবে।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অনুমান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রায় ২৬ কোটি শিশু-কিশোর এবং তাঁদের পরিবার উপকৃত হবেন। দ্রুত রোগ নির্ণয়, প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে ইনসুলিন, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ এবং নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুদের ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা কমানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি সারা দেশে শিশুদের অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0