ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের পরই মাঠে সেনার নারকীয় নির্যাতন, আজও শোনা যায় গণহত্যার আর্তনাদ!
দেশের অন্যতম সেরা ফুটবল স্টেডিয়াম। জাতীয় দলের অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচের সাক্ষী। এমনকি যে মাঠে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয়ের উৎসব করেছে, সেই মাঠই একসময় পরিণত হয়েছিল বন্দিশালা ও হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রে। ফুটবলের আনন্দ থেকে গণহত্যার বিভীষিকা—এই নির্মম ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে চিলির ‘এস্তাদিও নাসিওনাল’-এর সঙ্গে।
১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল চিলি। ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন পেলে। প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে গোল করার পাশাপাশি গোলের সুযোগও তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু চেকোস্লোভাকিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচে চোট পেয়ে তাঁর বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে যায়।
তারপরও থেমে থাকেনি ব্রাজিল। পেলেকে ছাড়াই ফাইনালে পৌঁছে যায় সেলেকাও। চিলির জাতীয় স্টেডিয়াম এস্তাদিও নাসিওনালে আয়োজিত সেই ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল চেকোস্লোভাকিয়া। ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় ব্রাজিল। গ্যারিঞ্চার নেতৃত্বে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ৩-১ গোলে জয় পায় তারা। ৬৮ হাজারেরও বেশি দর্শকের সামনে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় সেলেকাও।
কিন্তু মাত্র ১১ বছর পর ফুটবল ঐতিহ্যে ভরা সেই স্টেডিয়ামই ঢেকে যায় রক্তাক্ত ইতিহাসে।
১৯৭৩ সালে চিলিতে ক্ষমতায় ছিল প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী সরকার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটায়। সংকটের মধ্যেও দেশ ছাড়তে অস্বীকার করেন আলেন্দে। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর চিলিতে শুরু হয় সামরিক শাসন এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন।
সেই সময় এস্তাদিও নাসিওনাল সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়ে মাঠটি পরিণত হয় রাজনৈতিক বন্দিদের আটককেন্দ্রে। হাজার হাজার মানুষকে সেখানে ধরে এনে দিনের পর দিন বন্দি রাখা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্টেডিয়াম চত্বরে অন্তত ৪১ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রায় ২০ হাজার মানুষকে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে সেখানে আটক রাখা হয়। কেউ কেউ টানা দুই মাস পর্যন্ত বন্দি ছিলেন। তাঁদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে বহু প্রত্যক্ষদর্শী ও মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, সরকারি হিসাবের তুলনায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। বহু বন্দিকে নির্যাতনের পর হত্যা করে তাঁদের দেহ রাস্তা, নদী বা অজ্ঞাত স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। অনেকের শেষকৃত্যের সুযোগও মেলেনি।
যে স্টেডিয়াম একসময় ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের উল্লাসে কেঁপেছিল, সেই মাঠেই পরে শোনা গিয়েছিল বন্দিদের আর্তনাদ। এস্তাদিও নাসিওনাল তাই শুধু ফুটবলের ইতিহাস নয়, চিলির রাজনৈতিক হিংসা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও এক ভয়াবহ স্মারক।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0
